দফ ও বাদ্যযন্ত্র হালাল নাকি হারাম ? মুফতি আরিফ বিন হাবিব
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আধুনিক যুগে বিনোদনের নামে আমরা এমন অনেক কিছুর সাথে জড়িয়ে পড়ছি যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাদ্যযন্ত্র এবং গানবাজনা। দফ ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট ইসলামি আলোচক মুফতি আরিফ বিন হাবিব। তাঁর সেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি পাঠকদের জন্য নিচে তুলে ধরা হলো।
![]() |
| দফ ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের বিধান ও সতর্কবার্তা | মুফতি আরিফ বিন হাবিব |
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা: চারটি জিনিস হারাম
ইসলামের প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
- الدُّفُّ হারামٌ (দফ হারাম)
- والمعازفُ হারামٌ (বাদ্যযন্ত্র হারাম)
- والكُوبةُ হারামٌ (ঢোল, তবলা হারাম)
- والمزمارُ হারামٌ (গানবাজনা হারাম)
(সূত্র: তবরানী-৭৩৮৮)
দফ (الدف): সঠিক পরিচয় ও বিধান
দফ সম্পর্কে আমাদের সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। মুফতি আরিফ বিন হাবিব হাদিসের ব্যাখ্যা ও ফিকহের আলোকে দফের বিবরণ এভাবে দিয়েছেন:
- পরিচয়: দফ বলা হয় ঐ বাদ্যযন্ত্রকে যার উপরের অংশ চালুনির মতো, যাতে ঝুনঝুন আওয়াজ থাকে না এবং একপাশে চামড়ার পর্দা টেনে বাঁধা হয়। (মু‘জামু লুগাতিল ফুক্বাহা, পৃ. ১৮৬)
- রাসূল (সা.)-এর যুগের দফ: নবীজি (সা.)-এর যুগে দফ ছিল একপাশ খোলা একপ্রকার ঢোলবিশেষ, যা বাজালে ঢ্যাব ঢ্যাব আওয়াজ হতো। প্রকৃতপক্ষে দফ সঙ্গীতের কোনো বাদ্যযন্ত্রের পর্যায়ে পড়ে না। আউনুল বারি গ্রন্থাকার বলেন, দফের আওয়াজ স্পষ্ট ও চিকন নয় এবং সুরেলা ও আনন্দদায়কও নয়। কোনো দফের আওয়াজ যদি চিকন ও আকর্ষণীয় হয়, তখন তা আর দফ থাকবে না; বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হবে। (আউনুল বারি : ২/৩৫৭)
- বাদ্যযন্ত্র হিসেবে দফের ব্যবহার: যদি কোনো ব্যক্তি দফকে বাদ্যযন্ত্রের মতো ব্যবহার করে, তবে বাদ্যযন্ত্র হিসেবেই গণ্য হবে। মোল্লা আলী কারি (রহ.) বলেন, আর দফের মধ্যে যখন বাদ্যযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য এসে যাবে, তখন তা সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়েজ বলে পরিগণিত হবে। (মিরকাতুল মাফাতিহ : ৬/২১০)
দফ ও বাদ্যযন্ত্রের ভয়াবহ পরিণাম: সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনা
হাদিসে দফ ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের কারণে শেষ জমানার এক ভয়াবহ শাস্তির কথা বলা হয়েছে। সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত:
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমার উম্মতের মাঝে এক দল লোকের শেষ জমানায় বানর ও শূকরের সুরতে চেহারা বিকৃতি ঘটবে।"
সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! অথচ তারা সাক্ষ্য দিবে নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর মনোনীত রাসূল আর আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোন মাবুদ নেই?" নবীজি (সা.) বললেন, "হ্যাঁ, এবং তারা নামায ও পড়বে, রোজাও রাখবে, এবং হজ্বও করবে।"
সাহাবারা জানতে চাইলেন, "তবে তাদের অপরাধটা কী?" নবীজি (সা.) উত্তরে বললেন, "তারা বাদ্য ও গায়িকা আর ‘দফ’ বাজানোকে গ্রহণ করবে। আর মদ খেয়ে প্রমোদ করে মাতাল হয়ে রাত কাটিয়ে সকালে বানর ও শুকরে পরিণত হবে।"
— (উমদাতুল কারী, খণ্ড-৩১, পৃষ্ঠা-১৬৭, কিতাবুল আসরিবাহ)
ফকীহগণের অভিমত
ইসলামের বিখ্যাত ইমাম ও ফকীহগণ দফের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন:
১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.): ইমাম আবু হানিফা রাহ. এ ব্যাপারে সবচেয়ে কঠোর। তাঁর মাযহাব হলো সবচেয়ে কঠিন। তাঁর সঙ্গীরা একথা সুস্পষ্ট করেছেন যে, সকল প্রমোদ সামগ্রী হারাম; সর্বপ্রকার বাঁশি এবং “দফ” ও। এমনকি লাঠি দিয়ে বাড়ি মারাও গুনাহ, যা ফাসেক হওয়াকে ওয়াজিব করে, যার ফলে তার সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য নয়। বরঞ্চ ফুকাহারা বলেন—এসব দ্বারা আনন্দ নেওয়া কুফরী। (নাউজুবিল্লাহ) {আউনুল মাবুদ-১৩/১৮৬}
২. তাবেয়ীগণ: "দফ বাজানো" তাবেয়ীনদের এক জামাত দফ ভেঙে ফেলতেন। আর হাসান বসরী রাহ. বলেছেন—দফ বাজানোতে নবী অনুসরণের কিছু নেই। {তালবীছে ইবলীস-১/২৯৩}
৩. শোনা ও আমল: দফের বাজনা ও বাঁশির আওয়াজ এবং এ জাতীয় বিষয় শোনা হারাম। আর যদি আচমকা শুনে ফেলে তবে তাকে মাজুর (ক্ষমাযোগ্য) ধরা হবে। আর চেষ্টা করবে যেন তা না শুনতে পায়। [রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাজরি ওয়াল ইবাহা]
দফ ও বিয়ের হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা
অনেকে দফ প্রমাণ করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী—‘বিয়েকে প্রকাশ করো যদিও দফের দ্বারা হয়’ (أعلنوا النكاح ولو بالدف) এই হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে থাকেন যে, বিয়েতে দফ বাজানো জায়েজ কোনো শর্ত ছাড়াই এবং এটা সুন্নত। এ বিষয়ে মুফতি আরিফ বিন হাবিব সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করে বলেন:
গভীরভাবে চিন্তা করলে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্দেশ্য এর দ্বারা কেবল প্রচারণার গুরুত্ব বুঝানো। কেননা তৎকালে কোনো কিছু ‘ইলান’ বা ঘোষণা করার জন্য দফে বাড়ি মারলে লোকজন একত্রিত হতো, তারপর ঘোষক তার বক্তব্য বলে সবাইকে শোনাতো।
হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. এর “বিয়ে শাদিতে বাজনা বাজনোর একটি বিরল তাহকীক” নামে লিখিত প্রবন্ধে (যা মুফতী শফী রহ. এর ফতোয়া সংকলন জাওয়াহিরুল ফিক্বহ এর চতুর্থ খন্ডের ২০৮ নং পৃষ্ঠায় সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে) বুস্তানুল আরেফীন ও নিসাবুল ইহতিসাব এবং শরহে নুকায়া গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেন—
وفى شرح نقايه – قال التور بشتى انه حرام على قول اكثرالمشاءخ وما ورد من ضرب الدف فى العرس كناية من الاعلان
অর্থাৎ আল্লামা তুরে পেশতী রহ. বলেন, অধিকাংশ মাশায়েখে কেরামের মতে দফ বাজানো হারাম। তবে বিয়েতে দফ বাজানোর ক্ষেত্রে যেসব বর্ণনা এসেছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রচারণা করা। সুতরাং বুঝা গেলো বিয়েতে দফ বাজানোর কথা বলার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রচারণা করা, আসলেই দফ বাজানো নয়।
তাছাড়া বুখারী (হা/৫১৪৭, ৯NT২), ইবনু মাজাহ (হা/১৮৯৬, ১৮৯৯) ও তিরমিযী (হা/৩৬৯০)-র যেসব হাদীস দিয়ে দফের বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করা হয়, সেখানে মূলত ২টি বিষয় লক্ষণীয়:
১. বিয়ে ও ঈদের দিনের কথা এসেছে।
২. নাবালিকা বালিকাদের দফ বাজানোর কথা এসেছে। সেজন্য প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী কিংবা পুরুষের জন্য দফ বাজানো মোটেও জায়েয নয়।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে বাদ্যযন্ত্রের আলোচনা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
"তাদের মধ্যে যার উপর তোমার ক্ষমতা চলে নিজ ডাক (আওয়াজ দ্বারা) দ্বারা বিভ্রান্ত কর।" — (সূরা বনী ইসরাঈল: ৬৪)
বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. এবং আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. বলেন, এখানে ‘ইবলিসের আওয়াজ’ বলতে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯)
হাদিসের আলোকে বাদ্যযন্ত্রের শাস্তি ও নিষেধাজ্ঞা:
- বাদ্যযন্ত্র হালাল মনে করা: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন—"আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে।" (বুখারী- ৫৫৯০)
- কানে আঙুল দেওয়া: নাফে‘ (রা.) বলেন, একদা ইবনু ওমর (রা.) বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনতে পেলে তিনি তাঁর দুই কানে দুই আঙুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গেলেন। রাসূল (সা.)-কেও তিনি এমন করতে দেখেছিলেন। (ছহীহ আবূদাঊদ হা/ ৪৯২৪)
- তিনটি ভয়াবহ বিপদ: আনাস (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যখন আমার উম্মত নেশাদার দ্রব্য পান করবে, গায়িকাদের নিয়ে নাচ-গানে মত্ত হবে এবং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত হবে তখন অবশ্যই তিনটি ভয়াবহ বিপদ নেমে আসবে—(১) ভূমি ধসে যাবে, (২) উপর থেকে বা যুলুম অত্যাচার চাপিয়ে দেওয়া হবে, (৩) আকার-আকৃতি বিকৃত করা হবে। (তিরমিজি - ২২১২)
- বাজনাদার নুপুর: আয়েশা (রা.)-এর সামনে নুপুর পরা এক বালিকাকে আনা হলে তিনি বলেন, এর পা থেকে নুপুর না খুলে তাকে আমার কাছে আনবে না। তিনি আরো বলেন, "যে ঘরে ঘণ্টা থাকে সে ঘরে ফিরিশতা প্রবেশ করে না।" (আবু দাউদ-৪২৩১)। মৃদু আওয়াজের ঘণ্টি-ঘুঙুরের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে আধুনিক সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের বিধান কী হবে তা সহজেই অনুমেয়।
- ঢোল ও তবলা: হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলিয়াছেন—"নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা মদ্যপান করা, জুয়া খেলা এবং ঢোল (কূবা) বাজানো হারাম করিয়াছেন।" ফুকাহাগণ বলেন, কূবা অর্থ তবলা। (বায়হাক্বী, মিশকাত হা/৪৫০৩)
হাদিস অস্বীকারকারীদের জন্য একটি জরুরি বার্তা
অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন, "তোমাদের জন্য সকল প্রকার বাদ্যযন্ত্র হারাম—আল্লাহ কুরআনে ডাইরেক্ট কেন বললেন না?" মূলত এগুলো হাদিস অস্বীকারকারীদের প্রশ্ন। তাদের উত্তর দিতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বেই সতর্ক করে বলেছেন:
"অচিরেই কোনো ব্যক্তি তার আসনে হেলান দেওয়া অবস্থায় বসে থাকবে এবং তার সামনে আমার হাদীস থেকে বর্ণনা করা হবে, তখন সে বলবে—আমাদের ও তোমাদের মাঝে মহামহিম আল্লাহ্র কিতাবই যথেষ্ট। আমরা তাতে যা হালাল পাবো তাকেই হালাল মানবো এবং তাতে যা হারাম পাবো তাকেই হারাম মানবো। (মহানবী সাঃ বলেন) সাবধান! নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম করেছেন তা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার অনুরূপ।"
— (ইবনে মাজা- ১২)
পরিশেষ
মুফতি আরিফ বিন হাবিবের এই বিস্তারিত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে বাদ্যযন্ত্র এবং আধুনিক সুরেলা দফের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। দুনিয়ার সাময়িক আনন্দের চেয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী মুক্তি ও আল্লাহর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকাটাই একজন মুমিনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বাদ্যযন্ত্রের এই ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।



*Don't spam! All comments reviewed by Admin