হালাল-হারামের বাছবিচার ও সুদের ধোঁয়া: আমরা কি তাহলে এক ভয়ংকর যুগের বাসিন্দা?
আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে মরুভূমির বুকে বসে এক মহামানব ভবিষ্যতের একটা জীবন্ত ছবি এঁকেছিলেন। সেই ছবিটা কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প ছিল না, ছিল আজকের বাস্তবতার এক নির্মম আয়না।
একটু চারপাশের দিকে তাকান তো—সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা টাকার পেছনে ছুটছি। কিন্তু কখনো কি বুক ধক করে ওঠার মতো করে ভাবছি, পকেটে যে টাকাটা ঢুকছে, সেটা কতটা খাঁটি? রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুটি বিখ্যাত হাদিস আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিলে যাচ্ছে। চলুন, একটু গভীরে গিয়ে দেখা যাক আমরা আসলে কেমন সময়ে বাস করছি।
![]() |
| রাসুল (সা:) এর ভবিষ্যতবাণী - আমরা কি তাহলে সেই ভয়ংকর যুগের বাসিন্দা? |
১. "টাকা আসলেই হলো, সোর্স দেখার টাইম নাই!"
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মানুষের ওপর এমন এক সময় আসবে, যখন মানুষ পরোয়া করবে না যে, সে কীভাবে সম্পদ উপার্জন করছে; হালাল উপায়ে নাকি হারাম উপায়ে।"
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৫৯আজকের কর্পোরেট আর ফ্রিল্যান্সিংয়ের যুগে এই হাদিসটার সত্যতা দেখে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। অফিস-আদালতে টেবিলের তলা দিয়ে নেওয়া ঘুষ, ব্যবসায় ওজনে কম দেওয়া বা '১০০% পিওর' বলে ভেজাল মেশানো, চড়া সুদে লোন নেওয়া, কিংবা online স্ক্যামিং—এগুলো যেন এখন আর কোনো অপরাধই না।
সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো, সমাজের একটা বড় অংশ এখন মনে করে, "ভাই, সততা দিয়ে পেট চলে না!" সৎ থাকতে চাইলে মানুষ তাকে 'বোকাসোকা' বলে উপহাস করে। অথচ উপার্জনের হালাল-হারামের ওপর আমাদের দোয়া ও ইবাদত কবুল হওয়া নির্ভর করে। আমরা ভাবছি ব্যাংকে ব্যালেন্স বাড়াচ্ছি, কিন্তু আসলে ঘরে অশান্তি আর জাহান্নামের আগুন ডেকে আনছি।
২. সুদের 'স্মার্ট' দুনিয়া ও ধূলিকণার ছোঁয়া
দ্বিতীয় হাদিসটি আমাদের আরও একবিংশ শতাব্দীর এক চরম গ্লোবাল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন:
"মানুষের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন কেউ সুদ খাওয়া থেকে বাঁচতে পারবে না। যদি কেউ সুদ নাও খায়, তবুও তার কাছে সুদের ধোঁয়া (অন্য বর্ণনায়: সুদের ধূলিকণা) পৌঁছাবেই।"
— আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাএকটু গভীরভাবে চিন্তা করুন। আপনি হয়তো ব্যাংকে টাকা রাখছেন না, সুদ খাচ্ছেন না, খুব সাবধানে চলছেন। কিন্তু আপনি যে চাল-ডাল বা জামাকাপড় কিনছেন, সেই বড় কোম্পানির ফ্যাক্টরি হয়তো সুদের লোন নিয়ে তৈরি। আপনি যে রাস্তা দিয়ে চলছেন বা মেগাপ্রজেক্টের সুবিধা নিচ্ছেন, তা হয়তো বিদেশি সুদি ঋণে করা। অর্থাৎ, আপনি সরাসরি সুদের সাথে যুক্ত না থাকলেও, এর 'ধোঁয়া' বা 'ধূলিকণা' কোনো না কোনোভাবে আপনার গায়ে এসে লাগছেই!
ইসলামে সুদকে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলা হয়েছে। অথচ আজকের 'স্মার্ট' দুনিয়ায় সুদকে 'ইন্টারেস্ট', 'প্রফিট শেয়ারিং' বা সুন্দর সুন্দর ফাইনান্সিয়াল মোড়কে আমাদের সামনে এমনভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে যে এটাকে আর কোনো অপরাধই মনে হয় না।
আমাদের এখন করণীয় কী? (The Action Plan)
পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, স্রোতের অনুকূলে ভেসে যাওয়া তো কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। এই কলুষিত সময়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের ৩টি কাজ করতে হবে:
শেষ কথা
আমরা হয়তো সেই 'ভয়ংকর' যুগের মধ্যেই বাস করছি, যা নিয়ে প্রিয় নবী (সা.) সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু মনে রাখবেন, পরীক্ষার প্রশ্ন যত কঠিন হয়, তাতে পাস করলে পুরস্কারও তত বড় হয়। এই ফেতনার যুগে যে ব্যক্তি নিজের পকেটকে হারাম ও সুদের ছোঁয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করবে, আল্লাহর দরবারে তার মর্যাদা হবে অনেক উঁচুতে。
আপনার মতামত কী? আজকের এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ হালাল থাকাটা আপনার কাছে কতটা কঠিন মনে হয়? নিচে কমেন্ট করে আপনার মূল্যবান মতামত জানান এবং পোস্টটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন!



*Don't spam! All comments reviewed by Admin